বাংলাদেশের আবাসন খাতে নতুন অর্থবছরের বাজেটে আবারও আলোচনায় এসেছে। ২০২৬-২৭ বাজেটে এই খাত কতটা স্বস্তি পেল, রিহ্যাব কী প্রত্যাশা করেছিল, আর বাস্তবে জমি ও ফ্ল্যাট কেনা-বেচা, রেজিস্ট্রেশন, কর ও ভ্যাটে কী পরিবর্তন আসছে – এটাই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ক্রেতা, ডেভেলপার এবং নির্মাণসংশ্লিষ্ট শিল্পের জন্য বাজেটের সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৬–২৭ বাজেটে আবাসন খাত
এ বছরের বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সরকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য রেখেছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। সংখ্যাগুলো বড়, কিন্তু আবাসন খাতের মানুষের কাছে আসল প্রশ্নটা হলো – বাজেট তাদের জন্য কী রেখেছে?
উত্তরটা পরিষ্কার করেই দিয়েছেন রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল। তার কথায়, ফ্ল্যাট-জমি নিবন্ধন খরচ কমানো, কম সুদে গৃহঋণ, আর নির্মাণসামগ্রীতে কর কমানো – এই দাবিগুলোর কোনোটাই বাজেটে জায়গা পায়নি। বরং নির্মাণসামগ্রীতে নতুন কর বসায় খরচ আরও বাড়বে। তবে একটা ভালো খবরও আছে – অপ্রদর্শিত টাকা এখন নির্দিষ্ট শর্তে আবাসনসহ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এটাকে রিহ্যাব ইতিবাচকভাবেই দেখছে।
জমি কেনা-বেচায় কী পরিবর্তন আসছে
এটাই এই বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত অংশ। কয়েকটা পয়েন্টে বলি,
জমির মালিকের ফ্ল্যাটে নতুন কর
এখন একটা প্রজেক্টে জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে যে সাইনিং মানি পান, তার ওপর ১৫% কর দিতে হয়। নতুন বাজেটে বলা হচ্ছে, জমির মালিক যে ফ্ল্যাটগুলো পাবেন (জয়েন্ট ভেঞ্চারে), তার ওপরও আলাদা করে আরও ১৫% কর দিতে হবে।
উদাহরণ দিয়ে বলি – ২৪ ইউনিটের একটা প্রজেক্টে জমির মালিক যদি ১২টা ফ্ল্যাট পান, আর সেগুলোর দাম ১২ কোটি টাকা হয়, তাহলে তাকে কর দিতে হবে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। মানে প্রায় দুটা ফ্ল্যাটের দামই চলে যাবে কর পরিষদ করতে। এটা শুনে অনেক জমির মালিকই জয়েন্ট ভেঞ্চারে যেতে আগ্রহ হারাতে পারেন বলে রিহ্যাব মনে করছে।
রেজিস্ট্রেশন খরচ
জমি বা ফ্ল্যাট কিনলে এখন স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর – সব মিলিয়ে মোট দামের ১৩%-এর বেশি খরচ হয়ে যায়। রিহ্যাব চেয়েছিল এটা ৭%-এ নামিয়ে আনা হোক, যাতে মানুষ সত্যিকারের দাম দেখিয়েই জমি রেজিস্ট্রি করায়। কিন্তু এই বাজেটে সে বিষয়ে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
অপ্রদর্শিত টাকা জমিতে বিনিয়োগের সুযোগ
এটা একটা ভালো দিক। অনেকেই প্রবাসে আয় করা টাকা বা উত্তরাধিকারে পাওয়া সম্পদ সময়মতো দেখাতে পারেন না। তাদের জন্য এখন একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায়, প্রশ্ন না করেই জমি বা আবাসনে বিনিয়োগের সুযোগ থাকছে। এতে অনেক টাকা যেটা এখন ঘরে বসে আছে, তা বাজারে আসতে পারে।
সহজ ভাষায় বললে – জমি কেনাবেচার মূল খরচ আগের মতোই থাকছে, কিন্তু জয়েন্ট ভেঞ্চারে জমি দেওয়া মালিকদের জন্য খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়বে
ফ্ল্যাট কিনতে চাইলে কয়েকটা জিনিস মাথায় রাখা ভালো। প্রথমত, রড়ের ওপর ভ্যাট বাড়ছে– প্রতি টনে ১৫০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা। নির্মাণ সেবার ভ্যাটও বাড়ছে ৭.৫% থেকে ১০%। মানে নতুন ফ্ল্যাট বানাতে ডেভেলপারের খরচ বাড়বে, আর এই খরচ ঘুরে এসে পড়বে ক্রেতার ঘাড়ে।
দ্বিতীয়ত, জমির মালিকের ফ্ল্যাটে যে নতুন কর বসছে, সেটারও একটা অংশ শেষমেশ ফ্ল্যাটের দামে যুক্ত হতে পারে।
তবে ভালো খবরও আছে—পুরাতন ফ্ল্যাট কেনাবেচার জন্য একটা আলাদা বাজার (সেকেন্ডারি মার্কেট) চালুর দাবি রিহ্যাব দীর্ঘদিন করছিল। এটা এখনো হয়নি, তবে অপ্রদর্শিত টাকা বিনিয়োগের সুযোগ থাকায় অনেকে ফ্ল্যাট কেনায় আগ্রহী হতে পারেন, যা বাজারে কিছুটা গতি আনতে পারে।
রেজিস্ট্রেশন, কর ও ভ্যাটে সম্ভাব্য প্রভাব
আবাসন খাতের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো রেজিস্ট্রেশন, কর ও ভ্যাট। অনেক সময় এই তিনটি উপাদান মিলেই একটি ফ্ল্যাট বা জমির মোট খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
যদি বাজেটে –
- রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো হয়,
- উৎসে কর যৌক্তিক করা হয়,
- ভ্যাটের হার কমানো হয় বা সুবিধা দেওয়া হয়,
তাহলে আবাসন লেনদেনে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি এগুলো অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে বাজারে যে স্থবিরতা রয়েছে তা আরও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে ক্রেতারা শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত খরচ দেখে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন। ফলে শুধু ডেভেলপার নয়, সরকারও রাজস্ব আহরণে পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই কারণেই আবাসন খাতে ২০২৬-২৭ বাজেট ও রিহ্যাবের প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনায় কর ও ভ্যাট অন্যতম মূল ইস্যু।
ক্রেতা ও ডেভেলপারদের ওপর প্রভাব
ক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো ফ্ল্যাট ও জমির দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা। নির্মাণসামগ্রীর ওপর বাড়তি ভ্যাট এবং জমির মালিকের ফ্ল্যাটের ওপর নতুন করের বোঝা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের ওপরই বর্তাবে বলে রিহ্যাব আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। একইসঙ্গে নিবন্ধন ব্যয় কমার কোনো সুযোগ না থাকায় মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য ফ্ল্যাট বা জমি কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ডেভেলপারদের জন্য পরিস্থিতি আরও চাপের। উচ্চ নির্মাণ ব্যয়, ব্যাংক ঋণের সীমাবদ্ধতা এবং ক্রেতা সংকটের কারণে আবাসন খাত এমনিতেই গভীর চাপে রয়েছে। নতুন করের কারণে জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রকল্প নিরুৎসাহিত হলে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা কমে যেতে পারে, যা সরাসরি ডেভেলপারদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলবে। তবে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ ডেভেলপারদের জন্য স্থবির হয়ে থাকা প্রকল্পগুলোয় নতুন গতি আনতে সহায়ক হতে পারে।
আবাসন খাতে ২০২৬-২৭ বাজেট নিয়ে ম্যাক্সওয়েল ওয়েষ্টার্ন সিটি এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আহমেদ বলেন,
বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগের যে সুযোগ রাখা হয়েছে, সেটা আসলে এই খাতের জন্য একটা বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। তিনি বলেন, “অনেক মানুষের হাতে এমন টাকা আছে যা তারা এতদিন বিনিয়োগ করতে পারছিলেন না, ভয় বা জটিলতার কারণে। এখন সেই টাকাটা নিরাপদে আবাসনে আসার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে – এটা শুধু আমাদের খাতের জন্য না, পুরো অর্থনীতির জন্যও ভালো খবর।
তিনি ক্রেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, ম্যাক্সওয়েল ওয়েষ্টার্ন সিটি সবসময় চেষ্টা করে এমন প্রকল্প তৈরি করতে, যেখানে বাজেট পরিবর্তনের প্রভাব যতটা সম্ভব কম পড়ে গ্রাহকের ওপর, আর মানুষ নিশ্চিন্তে তাদের স্বপ্নের ফ্ল্যাট বা প্লট নিতে পারে।
রিহ্যাব কী প্রত্যাশা করেছিল
রিহ্যাব বা রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ সবসময়ই আবাসন খাতের জন্য নীতিগত সহায়তা চেয়ে থাকে। তাদের প্রধান প্রত্যাশার মধ্যে থাকে
- ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধন খরচ কমানো
- উৎসে কর যৌক্তিক করা
- ভ্যাট কাঠামো সহজ করা
- নির্মাণসামগ্রীর দামজনিত চাপ কমানো
- মধ্যবিত্তের জন্য affordable housing incentive
- কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা
- ব্যাংকঋণ সহজলভ্য করা
রিহ্যাবের দৃষ্টিতে, আবাসন খাত শুধু ডেভেলপারদের ব্যবসা নয়; এটি ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট, রড, টাইলস, স্যানিটারি, পেইন্ট, ফার্নিচারসহ বহু শিল্পকে সক্রিয় রাখে। তাই তারা বাজেটে এমন পদক্ষেপ চায়, যাতে একদিকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি না হয়, অন্যদিকে বাজারও চাঙা থাকে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
সার্বিক বাজেট নিয়ে সবাই একমত নয়। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এই বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব বলছে, যদিও বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলেও মনে করছে তারা। আরেকদিকে সিপিডির মতে, বাজেটের অনেক লক্ষ্য বাস্তবতার চেয়ে একটু বেশি আশাবাদী ধরে নেওয়া হয়েছে।
আবাসন খাত নিয়ে রিহ্যাবের অবস্থানটা সহজ – করের হার বেশি হলে মানুষ টাকা গোপন করে, কম হলে স্বেচ্ছায় কর দেয় আর সরকারের রাজস্বও বাড়ে। তাদের মতে, এই সহজ সত্যিটা মাথায় রেখে নীতি ঠিক করলে আবাসন খাত আর সরকার – দুই পক্ষেরই লাভ হবে।
আবাসন খাতের সামনে কী অপেক্ষা করছে
সব মিলিয়ে আবাসন খাতে ২০২৬-২৭ বাজেট ও রিহ্যাবের প্রত্যাশা নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন এখনই সহজ নয়। বাজেটে যদি নিবন্ধন, কর, ভ্যাট ও লেনদেন খরচের চাপ কিছুটা কমে, তাহলে বাজারে আস্থা বাড়তে পারে। কিন্তু যদি প্রয়োজনীয় সংস্কার না আসে, তাহলে আবাসন খাতে স্থবিরতা আরও দীর্ঘ হতে পারে।
রিহ্যাব চায় এমন একটি বাজেট, যা একদিকে সরকারের রাজস্ব নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য ফ্ল্যাট ও জমি কেনা কিছুটা সহজ করবে। ক্রেতা, ডেভেলপার এবং নির্মাণসংশ্লিষ্ট শিল্প– সবাইই এখন দেখছে বাজেট কতটা বাস্তবসম্মত এবং কতটা বাজারবান্ধব।
শেষ পর্যন্ত, আবাসন খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু বাজেট ঘোষণার ওপর নয়, বরং সেই নীতিগুলো কত দ্রুত ও কত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয় তার ওপর।
আবাসন খাত, জমি-ফ্ল্যাট কেনাবেচা ও বাজেট সংক্রান্ত আরও আপডেট জানতে Maxwell Western City-এর সঙ্গে যুক্ত থাকুন।